৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৪২ | সাপ্তাহিক  | ২১ জুন ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর ভাবনা

ভজন সরকার

আমরা মানি বা নাই-বা-মানি, বিশ্ব এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও মানুষের কাছে বেঁচে থাকার উপকরণের চাহিদাই অনেকাংশে অপূরণীয় ও কাংখিত ছিল। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ণের ফলে মানুষ একধরণের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের অভাব খানিকটা হলেও সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে সারাবিশ্বেই- কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। কিন্তু জাগতিক চাহিদা সহনীয় হলেও হঠাৎ করেই যেন পারলৌকিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগীতা বিশ্বকে অসহনীয় করে তুলতে চাইছে। মোটা কথায়, এখন প্রতিযোগীতা চলছে কা’দের ঈশ্বর কা’দের থেকে শ্রেষ্ঠ,কা’দের থেকে শ্রেষ্ঠতর কিংবা কা’দের থেকে শ্রেষ্ঠতম। একটি নৈর্ব্যক্তিকতার ধারণার প্রভুত্ব নিয়ে কী-না ঘটছে সারা পৃথিবী জুড়েই।

আমরা যদি বাঙালিদের মহাপুরুষ কিংবা কালদ্রষ্টা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তর্কের উর্ধ্বে উঠে স্বীকার করে নিই, তবে স্বভাবতই জানতে ইচ্ছে করবে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঈশ্বর নিয়ে কী ভাবনা-চিন্তা করতেন?

ঈশ্বর ভাবনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ সচেতন ছিলেন। তাঁর এ সচেতনতা জন্মগত সুবিধের কারণে। ঠাকুর দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী বা বৈষ্ণবভক্ত। নিজে পরবর্তীতে একেশ্বরে বিশ্বাসী হলেও তিনি তাঁর পারিবারিক দেবতার পূজা থেকে কখনো বিরত থাকেননি। দ্বারকানাথের ছেলে অর্থ্যাৎ রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈশবে পূজা অর্চনায় অংশ নিতেন। কিন্ত রাজা রামমোহন রায়ের সংস্পর্শে এসে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মূর্তিপূজা বা পৌত্তলিকতা বিরোধী হয়ে উঠলেন। তারপরের কাহিনী তো সবার জানা। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি একসময় ব্রাহ্ম সমাজের পীঠস্থান হয়ে উঠলো। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা সে পরিবেশের মধ্যেই কেটেছে। যার প্রতিফলন ঈশ্বর নিয়ে রবীন্দ্রনাথের নৈর্ব্যক্তিক ভাবনা থেকেই বোঝা যায়।

নিজের পরিবার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নিজেই একবার বলেছেন, “ হিন্দু, মুসলমান ও ব্রিটিশ, এ তিন সংস্কৃতির সংগমের ফল”।

কিন্তু এ প্রেক্ষিতে একটি কথা বললে অত্যুক্ত হবে না যে, ব্রাহ্মধর্ম শিক্ষিত মানুষের পরিধির বাইরে বেরোতে পারেনি। তার কারণ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মানুষজনের কাছে কিংবা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে তো আমজনতার প্রবেশাধিকারই ছিল না। ফলে ছিল না ব্রাহ্ম সমাজের সাথে অগনিত সাধারণ মানুষের যোগাযোগ। অনেকে তাই আক্ষেপ করে বলে থাকেন, একটি যুগোপযোগী সমাজ পরিবর্তন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে এই তথাকথিত শিক্ষিত সুশীলদের বাতারণের জন্য।

যাহোক সে অন্য আলোচনার বিষয়। রবীন্দ্রনাথ নিজে সে সুবিধেভোগী সমাজের একজন হয়ে হিন্দু ধর্ম থেকে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত যে ব্রাহ্ম সমাজ সে উদার ও উন্নত মানসিক চিন্তাচেতনার একজন হয়ে বেড়ে উঠেছেন।

তাই রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর ভাবনাটিও আমজনতার ঈশ্বরভাবনা থেকে আলাদা। অনেকে বলে থাকেন- সার্বজনীন। সার্বজনীন এ অর্থে যে, যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী তাঁর বিশ্বাসের সাথে যেমন দ্বন্দ্বমুখর নয়, তেমনি নয় যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস নিয়ে সন্দিহান কিংবা অবিশ্বাসী তাঁর ক্ষেত্রেও।

কারণ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বিশেষ করে পূজা পর্বের গানে ঈশ্বরে নিবেদন বা সমর্পন এমন নৈর্ব্যক্তিকতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন যে, যে কেউ তাঁর মতো করে সে ভাব ও ভাবনাকে প্রতিস্থাপন করে নিতে পারেন। তাই পূজা ও প্রেম একাকার হয়ে দেখা দেয়। ফলে পূজা পর্বের গানের ভাব যেমন মিলে যায় প্রেমের ব্যাকুলতায়, তেমনি ব্যক্তিপ্রেমও একাকার হয়ে মিলে যায় পূজার নৈবেদ্যে।

রবীন্দ্রনাথ আগাগোড়া ধর্মীয় ভেদাভেদ থেকে মুক্ত থাকতেই চেয়েছিলেন। তাই তাঁর রচনায় ঈশ্বর এক নৈর্ব্যক্তিকতায় বর্ণিত হয়েছে, সেখানে কারও কোনো বিশ্বাসের সাথে দ্বন্ধ দেখা দেয় না। বরং এক আনন্দ, সুন্দর ও মনোজাগতিক বিকাশ ও প্রশান্তির উপায় হিসেবে ঈশ্বরের দেখা মেলে রবীন্দ্রনাথের বিশেষত কবিতায় ও গানে। এ প্রসংগে গীতবিতানের পূজা পর্বের গানগুলোর উল্লেখ করা যেতেই পারে।

বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির সংমিশ্রিত পরিবারে জন্ম নিয়েও রবীন্দ্রনাথ কখনোই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মকে একটি একীভূত মিলিত ধারায় প্রবাহিত দেখতে আগ্রহী ছিলেন না। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের শেষ জন্মদিনের কিছু আগে লিখিত প্রবন্ধ, যা তাঁর সর্বশেষ প্রবন্ধ,” সভ্যতার সঙ্কট”-সেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন কিভাবে ধর্মের নামে ভারত হিন্দু-মুসলিম দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। তবু তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে কখনোই এ ধারা দু’টো সংমিশ্রণের চেষ্টা করেননি। অনেকে বলে থাকেন, মুগল সম্রাট আকবরের ব্যর্থ প্রচেষ্টা থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছিলেন। কেননা, সম্রাট আকবর “দ্বীন-এ এলাহি” নিজের মহাপ্রতাপশালী ক্ষমতা সত্বেও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

তাই রবীন্দ্রনাথ সরাসরি ঈশ্বরের নানাবিধ বিশ্বাস নিয়ে কাউকেই সচেতনভাবে আঘাত করতে চাননি। বরং ঈশ্বর বা আধ্যাত্ববাদের মতো নৈর্ব্যক্তিক বিষয়কে বিমূর্ত ভাবনা দিয়েই মূর্ত করতে চেয়েছেন। দর্শনের স্তরে এটাই হয়ত ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসকে একটি একীভূত মিলিত ধারায় প্রবাহিত করার রবীন্দ্র-প্রয়াস???

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration